কবিতা আমি পড়ি কম। বুঝি আরো কম। সঞ্চয়িতা আমি পয়সা দিয়ে কিনিনি। সত্যিই। মৌনর সাথে যৌন আর বক্র র সাথে চক্র ছাড়া মিল খুঁজে পাইনা।
তবু পড়ে ফেললাম রঞ্জন আচার্যর কবিতার বই।
প্রথমেই বলে রাখি, আপনি, যিনি লিটার লিটার রক্তবমি আর হাজার হাজার আত্মহত্যা কিংবা রাষ্ট্রীয় খুন কে উপেক্ষা করে নিরাপদ সাহিত্যের ঢ্যমনামো করছেন, করে চলেছেন...বাগিয়ে নেওয়া আর লাগিয়ে নেওয়ার ফাঁকে সময় সুযোগ করে লেফট লিবারাল সেজে ততোধিক উদ্গান্ডু বামবাচ্চুয়া ফ্যানদের হাততালি,মলসোহাগী লিবারাল বামকুমারী কিংবা বামকামিনী দের 'ওয়াও' রিয়াক্ট গুনতে গুনতে পাক্কা বান্চোতের মত আবার আখের গুছাতে লেগে পড়ছেন তিনি এই বই পড়বেন না। আয়নায় নিজের সরীসৃপ দেহটা দেখে ফেলবেন। বাকি জীবন টা অমেরুদন্ডী ইম্পোটেন্ট হয়ে কাটাতে হবে। খবরদার আপনি ভুল করেও এই বই পড়বেন না। কারণ আপনি/আপনারা যেগুলো লেখেন সেগুলো আপনাদের হৃদয়ের নয়, ইনফ্যাক্ট আপনাদের হৃদয় , মেরুদন্ড, মস্তিস্ক কিছুই নেই। আপনাদের সন্ততি ও আপনাদের হৃদয়ের নয়! বাল-বিচি যা খুশি লেখেন আর মোসাহেব দের দিয়ে ঢাক পেটান। আপনি আগুন থেকে দূরে থাকুন ।
রঞ্জন আচার্যের এই বই এ কবিতা গুলো সব যেন পজিশন নিয়ে আছে এক একটা গেরিলাযোদ্ধার মত। এম্বুশের জন্য অপেক্ষা করছে। গোটা বইটাই যেন বুড়ি বালাম কিংবা দিয়েন-বিয়েন-ফু র পারে পজিশন নিয়ে থাকা একটা গেরিলা রেজিমেন্ট।
তাই ভূমিকাতেই কবি যা লিখছেন তা কবিতা নয় , রীতিমত গেরিলা ফৌজের কাছে পাঠানো এলার্ট মেসেজ।
"ঝান্ডা আরো শক্ত করে ধর
পরিস্থিতি বাঘ হচ্ছে রোজ
আজ নয় কাল ট্রিগারে চাপ
দিতেই হতে পারে
তখন যেন হাত না কাঁপে তোর"
এরপর প্রথম কবিতাটিতেই যুদ্ধের সুর বেঁধে দেওয়া।
"তুমি তো জন্মেই রঙচঙে ছাতা পেয়েছ
যাদের মাথায় ছাতা নেই কোনো
তারা তোমার দোসর হতে পারেনা
যতই কাঁধে হাত রাখোনা কেন
...
জানোনা দুঃখ কিভাবে বড় হয়
কীভাবে তার চোখ ফোটে রাতের পর রাত...."
(দোসর)
যুদ্ধ মানে শ্রেণীযুদ্ধ। শত্রু মানে শ্রেণী শত্রু। মিত্র মানে শ্রেনিমিত্র। ক্লিন এন্ড ক্লিয়ার।
যারা ছোটবেলায় ঝোপে ঝাড়ে ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম খেলতো, মফস্বলের দেওয়ালে দেওয়ালে নতুন শব্দ গুলো বানান করে পড়তো আর নিজের ভোকাব্যুলারি তৈরি হত,
মজদুর,মেহনতি,ইনকিলাব, ধর্মঘট,জোট বাঁধো, সাম্য, বর্গা, বিপ্লব...তারা যখন পাল্টাতে না পেরে নিজেরাই পাল্টে যায়
"তুমিও হেঁজে গেলে নাকি-
পকেটে হাত ঢুকিয়ে ভদ্রলোক সেজে
ভিড়ে গেলে বান্চোত দের দলে ? "
(আত্মবিশ্লেষন)
তাহলে বাতাসে বারুদের গন্ধ নেই কেন ? নেই কেন রৌদ্রে সন্ত্রাস ?
হ্যাঁ, কমান্ডার বলেই দিয়েছেন
"কবিতা এখনই লেখার সময়
ইস্তাহারে দেয়ালে স্টেনসিলে
নিজের রক্ত অশ্রু হাড় দিয়ে কোলাজ পদ্ধতিতে
এখনই কবিতা লেখা যায়!"
তাই কবিও ম্যান্ডেট দেন তার কবিতার ফৌজ কে
"সোজা হয়ে দাঁড়াও
পজিশন নাও আবার লড়াইয়ের
...
কঠিন একটা সময়
শুয়োরের বাচ্চারা বাঘের ছাল পরে
ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশের অলিতে গলিতে"
(সাবধান)
কখনো কখনো কবিতা আর কবিতা নয়, জাস্ট ওয়ার ক্রাই...সোজা সাপ্টা মালশাট!
"নিরীহ আপসে বিশ্বাস করে পশুরা
মানুষ বিশ্বাস করে পাল্টা অ্যাটাকে
মানুষের ক্ষিদে পেলে মানুষ চেল্লাতে পারবেনা
ভাঙতে পারবেনা খাদ্য-গোদামের তালা-
রাষ্ট্র বন্দুক দেখাবে
মেরে লাশ বানিয়ে দেবে দিনের আলোতে
মাথা নীচু করে গাইতে হবে জন-গণ-মন...
এটা কোন দেশীয় ফাজলামি
কোন ধরণের গণতন্ত্র! "
(সশস্ত্র সংগ্রাম)
পাঁচিলের ওপর গিরগিটি দেখতে পেলে ঢিল ছোঁড়ার অভ্যাস তো আমাদের ছোটবেলার। রং পাল্টানো গিরগিটি দেখলে যেকোনো বাচ্চারই হাত নিশপিশ করে ঢিল ছোঁড়ার জন্য। তেমনই একটা ঢিল। পেটো নয়, হ্যান্ড গ্রেনেড নয়। ঢিল। এই কবিতাটি গিরগিটির উদ্দেশ্যে।
"শাসক জানে তোমার দৌড়
তুমি মধ্যবিত্ত ছা-পোষা মানুষ
বড়জোর সিপিএম ছেড়ে
তৃণমূল হতে পারবে-বিজেপি হতে পারবে
অস্ত্র হাতে নামতে পারবেনা রাস্তায়।"
(মাপকাঠি)
অস্ত্র । কোথায় হারিয়ে গেল ছোটবেলার খেলনা বন্দুক। বাঁশ দিয়ে বানানো তীর-ধনুক ! পাথর দিয়ে বানানো আদিম মানুষের ওই কুড়ুল টা শুধু অস্ত্র নয় উৎপাদনের উপাদান। আবার চাষীর কাস্তেটা শুধু উপাদান নয় অস্ত্রও বটে ! ভুলেছো কি অস্ত্রের বন্ধুতা?
"আমাদের গণতন্ত্র আসলে সহ্য করার খেলা
বন্দুকের সাথে খালি হাতে লড়তে লড়তে
শহীদের মিথ্যে অহংকার ঝুলিয়ে রাখা দেওয়ালে
...
চাঁদ দেখতে ভুলে গেছি আমরা
ভুলে গেছি অস্ত্র হাতে অস্ত্রের সাথে লড়াই"
(ভাটের গল্প)
আরে ভাই অস্ত্র অচ্ছুৎ নয়, অস্ত্র কম্পলসরি।
রামায়ণ-মহাভারত-রাশিয়া-চীন-কিউবা-বলিউড-হলিউড। অস্ত্র আর একশন ছাড়া কিছুই হয়না।
যখন বন্দুকের সাথে সখ্যতার কথা ছিল
তখন ফুলের গন্ধ শুকেছ
এখন ভুলের মাশুল গুনতে কার্পণ্য কেন ?
রক্ত দেখে আঁতকে ওঠা
জন্মগত অভিশাপ আমাদের
এক অদ্ভুত ন্যাকামি
ফলত বদ রক্তের বাড়বাড়ন্ত"
(ঠ্যালা সামলাও)
অন্যত্র আরো স্পষ্ট । কেন অস্ত্র কম্পলসরি!
"রাষ্ট্রের সমস্ত বন্দুক জমা দাও কালীঘাটে
রাষ্ট্র হাতে গোলাপ নিলেই
আমরা নাহয় তুলে নেব সন্ধ্যামালতী
....
একপেশে গেম চলবে না"
(বাধ্যতামূলক)
সত্যিই আমি কবিতা কম পড়ি। তাই বুক রিভিউ লেখার উদ্দেশ্যে এই লেখা নয়। আসলে বর্ষার শেষে শরতের শুরুতে কোনো এক বিকেলে এক লম্বা বৃষ্টির পর বাংলার ত্রস্ত নীলিমায় যখন রং পাল্টে লাল থেকে নীল হয়ে কালো, যখন পাণ্ডুলিপির আয়োজনে জীবনের সব রং নিভু নিভু তখন এমনি কোনো বিকেলে মাঝে মাঝে ফড়িংয়েরা ওড়ে।সূর্যাস্তের শেষ রং ডানায় মেখে আগুন-ফড়িংয়েরা ওড়ে। বাঘমুন্ডি পাহাড়ের নীচে প্রগাঢ় পিতামহীর নির্দেশে টাঙিতে ধার পড়ে, ফার্ষা আর কেঁচা নিজেদের শলা-পরামর্শ সেরে নেয়। মেদিনীপুর আর তরাই থেকে কলকাতায় পড়তে যাওয়া কোনো সদ্য যুবা সাউথ সিটি মলের মেঝের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। ডিজাইনার টাইলস এর মেঝে ফুঁড়ে তুলে আনতে চায় মাটির নীচে লুকিয়ে রাখা রাইফেল। হারকাট্টার দেড়ফুট চওড়া গলিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বেশ্যাটা ভাবে একদিন সব আগুন নিভিয়ে দেবে পেট্রোল দিয়ে। জানি যাদের জাগার কথা ছিল জাগতে হবে এই ভয়ে মটকা মেরে থাকে...তবুও ফড়িংয়েরা ওড়ে। গর্জে ওঠে ন্যাংড়া, মাদোল, ...লন্ডনসমা এই মহানগরীর ঝলমলে আলোতেও" মনে হয় লিবিয়ার জঙ্গলের মত।
তবুও জন্তুগুলো আনুপুর্ব - অতি বৈতনিক,
বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত।"
হে তৃতীয় বিশ্বের জীব শুনে রাখো এ তুমুল গাঢ় সমাচার...
যখন তরাই থেকে সুন্দরবনের সীমা, সারারাত্রির কান্নার পর শুষ্ক দাহ্য হয়ে আছে, যখন জন্মভূমির মাটি আর বধ্যভূমির কাদা এক হয়ে গেছে তখন
"মৃত্যুকে কোণঠাসা করে ঘুরে দাঁড়াও আবার
নিজের কথা বলতে বলতেই
হাজার জন হয়ে উঠো তুমি
লাফ দিয়ে উঠে যাও অনেক উঁচুতে
পাক খেতে খেতে মাটিতে নেমে দেখাও- বেঁচে আছো
মনে রাখবে এ সংসারে তুমিও একজন জোকার"
(জোকার)
রঞ্জন আচার্যর কাব্যগ্রন্থ
‘মৃতদেহরই হেসে ওঠার সময়’, নাট্মন্দির, ১০০ টাকা

এই লেখাটা অনবদ্য। ফেসবুকে আগে পড়েছি মনে হচ্ছে। অসাধারণ।
ReplyDelete