গদ্যঃ বিধান চন্দ্র রায়

 

     বর্ধমান জেলার জলসম্পদের অপব্যবহার ও গ্রামীণ জেলে সমাজ

                                                        

হালার মাছ ধইরা যুত নাই’- ‘পদ্মানদীর মাঝিউপন্যাসের ধনঞ্জয়ের মুখের এই কথা আজও সমান সত্য এই বর্ধমান জেলায়। এই জেলায় জলসম্পদের অপব্যবহারের ফলে গ্রামীণ জেলে  সমাজ বড়ই অতান্তরে পড়েছে। জনস্ফিতির ফলে বিভিন্ন গোষ্ঠীর বসতি স্থাপন,কৃষিজমির চাহিদা,শিল্প কলকারখানার প্রয়োজন ইত্যাদির ফলে জলাভূমিতে টান পড়েছে। বিগত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে জেলার জলাশয়ের পরিমাণ ছিল ২০,৬১৯ হেক্টরের কাছাকাছি। বর্তমানে তা অনেকখানি কমে গেছে। এই জেলায় দেড় লাখ মত মৎসজীবী রয়েছেন,তাদের অধিকাংশই গঙ্গা, অজয়,দামোদরের মত বহতা নদীতে মাছ ধরেন। যদিও ক্রমবর্ধমান দূষণের  ফলে নদীগুলিতে মাছ কমেছে তবুও নদীই ভরসা অধিকাংশ মৎসজীবীর। আর এক শ্রেণির গ্রামীণ জেলে আছেন যাদের ভরসা পুকুর খাল বিল ইত্যাদি। গ্রাম বা শহরের জলাশয়গুলির অবস্থা পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে এই শ্রেণির জেলেরা কেমন আছেন।

বর্ধমান জেলায় পুকুরের সংখা নেহাত কম নয়। অতি প্রাচীন কাল থেকেই পুকুরসমৃদ্ধ স্থান এই জেলা। রাজাদের আমলেও বহু পুকুর খনন করা হয়েছে। বর্ধমান শহরেই তো শ্যামসায়র, রাণিসায়র, কৃষ্ণসায়র,কমলসায়র ইত্যাদি, যেমন তেমনি রাজতল্লাটের রাইরেও অনেক পুকুর রাজারা খনন করেছেন। শহর গ্রামের পুকুরগুলো মানুষের নানান প্রয়োজন মেটাতো সঙ্গে মাছ চাষ। ব্যক্তিমালিকানায় থাকা পুকুরগুলোতে জেলেরা মাছ ধরতো তিন ভাগের একভাগ হিসাবে। তাছাড়াও জেলেরা ভাগ চাষ করতো পরিমান মত মাছ অথবা টাকা চুক্তির ভিত্তিতে। বর্ধমান শহরের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে ঊঠে এল যে প্রসঙ্গটা তা অত্যন্ত ভয়াবহ। কালনা গেট চত্বরের একটা পুকুরে মাছ ধরতে ধরতে অনন্ত বিশ্বাস,লোকনাথ কৈবর্ত্যরা বললেন ‘ জাল ফললেই কেবল প্লাসটিক ব্যাগ ও বোতল উঠছে,মাছ নামমাত্র।’ সত্যই বসতি লাগোয়া শহরের পুকুরগুলিতে বাড়ির আবর্জনার সঙ্গে যে প্লাস্টিকসামগ্রী ফেলা হচ্ছে তাতে মাছ চাষে বড়ই অসুবিধা। মাছ বাড়ছে না অথবা টিকছে না,মরে যাচ্ছে। এক পুরোহিতের গলাতেও আক্ষেপের সুর, ‘আরে মশাই পারলৌকিক কাজ করতে মাঝে মাঝে পুকুরের ধারে যেতে হয়,এতো নোংড়া আবর্জনা যে কাজ করা যায় না।’ একটা অভিযোগ অমূলক নয়, সব সত্য। গ্রামের পুকুরের পাড়গুলোতেও বসতি ভরে উঠেছে। নিত্যদিনের আবর্জনা পুকুরেই ফেলা হয়। গৃহপালিত পশু দের ওখানেই স্নান করানো হয়। তার ফলে মাছ চাষের হাল খুবই খারাপ। একটা সময় পর্যন্ত রুই, কাতলা, মৃগেলের সঙ্গে চিন দেশের মাছ সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প একত্রে চাষ করে উৎপাদন রাতারাতি দ্বিগুণ করা সম্ভব হয়েছে। অত্যধিক দূষনের ফলে সেগুলো ব্যহত হচ্ছে। পাশাপাশি সিঙ্গি,মাগুর,কই ইত্যাদি স্বাভাবিক মাছগুলো অবলুপ্ত হচ্ছে মাটির দোষে।  

বর্তমান সময়ে বোরোধানের অত্যধিক প্রসার গ্রামের পুকুরগুলোকে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই চাষ করতে গিয়ে প্রথমেই হাত পড়ছে গ্রামের পুকুরগুলোতে। মূলত ফেব্রুয়ারি,মার্চ, এপ্রিল মাসে এই বোরো চাষ হয়। ভাতাড় থানার শিলাকোট গ্রামের মৎসজীবী স্বপন দাস কৈবর্ত্য ও দিলীপ দাস কৈবর্ত্য রা জানালেন, ‘এই সময়ই মাছেদের বাড়ার আসল সময়,আর এখনই পুকুর-ঘাট শুকিয়ে কাঠ। কি করে মাছের ভরসায় বেঁচে থাকবো বলুন।’

এই জেলে সম্প্রদায় ছাড়াও গ্রামের প্রান্তিকবর্গের মানুষেরা পুকুর,খাল, বিলের উপর ভরসা করে বেঁচে থাকতেনকিন্তু খাল বিল গুলোকেও চাষযোগ্য জমির মত ব্যবহার করে সেখানে ফসল ফলানো হচ্ছে। ভাদ্র আশ্বিন মাসের চুনো মাছের একটা বড় ভরসার জায়গা তাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অত্যধিক কীটনাশক প্রয়োগের ফলে চাষ জমিতে চ্যাং,কই,সিঙ্গি প্রভৃতি মাছ তো কবেই হারিয়ে গেছে।

আর একটা প্রবনতা ইদানিং লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জেলে সম্প্রদায়ের বাইরে বড় মাঝারি মৎস্য  ব্যবসায়ীরা পুকুরগুলো পুকুর লিজে নিয়ে নিচ্ছেন। কম সময়ে অত্যধিক লাভের দিকে তাকিয়ে তারা পুকুরে জৈব সারের পরোয়া না করে রাসায়নিক সার খোল ইত্যাদি প্রয়োগ করছেন ফলে  পুকুরের জলের যে স্বাভাবিকতা তা নষ্ট হচ্ছে। সাবেকি মাছের সাঙ্গে  জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

জেলে সম্প্রদায় অনেক প্রাচীন এক সম্প্রদায়। তাদের প্রচীনত্বের সাক্ষ বহন করছে আমাদের পুরান,আখ্যান কাব্যাদি। জল,জাল,ভেলা, পানসি বা নৌকা ,ভাটিয়ালি বা বাউল এগুলো নিয়ে নিজেদের বৃত্তে একটা জগৎ তারা তৈরি করে নিয়েছিলেনজল কে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে তাঁর  আশীর্বাদে জীবন যাপন করেছেন। আজ সেই গ্রামীণ জেলে সম্প্রদায়ের অনেকে তার পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। যে জাল কাঠি নিয়ে পুকুরপাড়ে বটের ছায়ায় বসে বাউলের তালে জাল বুনতেন,  মাথায় শোলা বা ভেলা লগি বা পানসি ডিঙ্গি করে পুকুর নদী মাতিয়ে বেরাতেন তিনি এখন পারি দিচ্ছেন ভিন রাজ্যে। এখন আর বোনেন না গাঁথেন অথবা দক্ষিণের কোনো শহরে ইমারত নির্মাণ শিল্পের যোগানদার।


1 comment:

  1. লেখাটা ভাবায়। কয়েকবছর আগেও গ্রামের দিকে বর্ষার সময় অঢেল মাছ পাওয়া যেতো। আজ পাওয়া যায় না। খুব বাস্তবধর্মী এই লেখার জন্য লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল সহযোগি...