সুদীপ পাঠক

 

ব্রেক ডাউন ভ্যান 

ফেলে আসা দিন 

 

.

 

লাইন থেকে চাকাটা বেরিয়ে এসেছে প্রায় এক হাত আমি ফার্স্ট ক্লাসেই ছিলাম বেশ কিছুক্ষণ ধরেই মনের মধ্যে 'কু' বাজছিল যে ভাবে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে ভাবলাম একবার চালকের পিন ফোটাই 'বলছিলাম যে দাদা এটা মেলবোর্ন নয় , চিৎপুর ' ব্যাস ঠিক হলও তাই ঘড় ঘড় ঘড়াং  

একেবারে মহাত্মা গান্ধী রোড ক্রসিংয়ে পৌনে দশটা জুনের মাঝামাঝি পিচ গলছে শিরদাঁড়া বেয়ে ঘাম নামছে কুলকুল করে ফুটপাতের এককোনে দাঁড়িয়ে আমি পরিদর্শক ডেসিবেল মাপকাঠির তোয়াক্কা কেউ করছে না বুড়ো আঙুল ঠেকিয়েই আছে সাদা হেলমেট পরা ভদ্রলোকটি হাত পেতেছিল একটা মেটাডোরের খালাসির কাছে আর তখনই মেজাজ গেছে খিঁচড়ে কাঁচা খিস্তির বন্যা বয়ে যায় আচ্ছা এই সময়ের বার্ডস আই ভিউটা কেমন লাগবে ? এদিকে সর্পিল দেহটা কেতরে আছে ওদিকে অসংখ্য গাড়ী , তার পিছনে ঠেলা রিক্সা পরপর ... নাহ্ শুভেন্দু ভট্টাচর্য্য তোমার আলোকচিত্রকরের সত্ত্বাকে চাপা দাও আজও বোধ হয় একটা সি এল খ্যাচাং কোনো রকমে একটা সি টি সির দরজা খুলে ভেতরে সেঁদোলাম কে আমি পুজারি বামুনের নাতি ! নাকি স্পাইডারম্যান ? একজন সুবেশা তন্বী উঠতেই একটা চিমসেকে ডজ করে ধপ করে বসে পড়লাম টু সীটারে পাশের টাক মাথা জিজ্ঞাসা করলো বুড়ো ঘোড়াটায় উঠেছিলেন বুঝি ? বললাম - হ্যাঁ এ্যা সঙ্গে একটু দাঁতও দেখলাম  

- কেন চড়েন ? হল তো ডবল খরচ - হাজার হোক কলকাতার সংস্কৃতির একটা অঙ্গ বলে কথা  

- রাখুন তো মশাই সংস্কৃতির ইয়ে চটকাচ্ছে দেখুন একই বংশকুলোদ্ভব হয়ে আচরণে কী বৈপরীত্য  

- তাতো হবেই নাতির সঙ্গে দাদু কি আর সমান তালে ছুটতে পারে বলুন ? এই বেঁধে বেঁধে লাল বাড়ী এসে গেছে  

দরজা খুলে ঢুকতেই দত্তদার মুখোমুখি সাহেব নিশ্চই খচে ফায়ার ? প্রশ্ন করতে হলো না , পানের বোঁটা থেকে চুন চেটে দত্তদা বলল - ইউ লাকি গাই , ঠাণ্ডা ঘর এখনো ঠান্ডাই আছে সীটে বসে বাঁ দিকে ঘাড় ঘোরালাম রোজই ঘোরাই 'মাস হল ঘোরাচ্ছি   সোহেলী নতুন টাইপিস্ট বললাম 

- কি ব্যাপার ? আজ কি ইস্যু ? মেয়ের কান বেঁধানো ! সে তো মিটে গেছে তাহলে ? দশটা এলি এইট্টিনের টুকরো খেলা করে বেড়াচ্ছে কি বোর্ডের ওপর মুখ না তুলে উত্তর দিলো 

- মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে নেংটি ইঁদুর বেড়েছে তো , তাই মাউস ট্র্যাপ পাততে গেছেন  

নাহ্ মেয়েটার রসবোধ আছে তার ওপর আবার স্লিভলেস পরে গালে টোল উফ্ আর পারা গেল না  

 

.

 

টিফিন পর্যন্ত করা হলো না ফাইলে মুখ থুবড়ে পড়ে ছিলাম এতক্ষণে সাদা কাঠি ধরিয়েছি আজ আমি দার্শনিক কেবলই ঘুরে ফিরে ডি-রেল গাড়ীটার ছবি চোখের সামনে ভাসছে সবাই পাশ কাটিয়ে চলে গেল কখন যে ব্রেক ডাউন ভ্যান আসবে ? ততক্ষণ অসহায় ভাবে পড়ে থাক কিন্তু এটা হল কেন ? গোটা কলকাতার ট্রাম লাইন তো মহাসমারোহে কংক্রিটের ঢালাই করা হল তাহলে? অবশ্য কিছু ফাঁকফোকর তো সর্বত্রই থেকে যায় আর নতুন কি! নাহ্ সেন্টিমেন্ট ডিপ ফ্রিজে তুলে রাখো তার চাইতে ধোঁয়ার রিং ছাড়া অনেক সহজ সোহেলী এসে টোকা দিল 

- এই যে কোথায় ডুবে গেলেন মশাই ?  

ঘোর কাটলে বলি - এই তো ইহলোকেই বর্তমান  

- দেখে তো মনে হচ্ছে না কেসটা কি জানতে পারি ?

ইনিয়ে বিনিয়ে বললাম ব্যাপারটা ।শুনে সহেলীর রি-এ্যাকশন 

- মাই গুডনেস ! আপনি বেঁচে আছেন কি করে ? আগামী দিনে মানে টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে লোকে হ্যাঙ্গিং মোনো রেলের কথা ভাবছে আরে ভাবছে কি দুদিন আগেই তো পেপারে দেখলাম আমাদের এখানে কোথায় যেনো এক্সপেরিমেন্টালি চালুও হয়েছে আর আপনি ! আমি তো মাঝে মধ্যেই ভাবি জবরজংটাকে রাস্তা থেকে তুলে দেয় না কেনো ? জ্যাম বাঁধাবার ওস্তাদ এই আপনার মতন সেকেলে ব্যাকডেটেড লোকজনের সংখ্যা বেশী বলে কলকাতার কিছু হল না বুঝলেন ? হুঁহ সত্যি মাইরি পারেন বটে তার চেয়ে বরং একটা কবিতা লিখুন

- বুঝলাম  

 

চারটে ছুঁই ছুঁই টেবিলে কাজ করছি হঠাৎ রীনা এসে সটান হ্যাঁচকা টান সহেলীর কটাক্ষ দত্তদার মুখে মাছি ঢুকে যাবার জোগাড় রীনার কোনো কিছুতেই ভ্রুক্ষেপ নেই  

- ওঠ চল

- মানে কোথায়

- নিউ মার্কেট , শপিং করার আছে

- আরে ... তুই এভাবে ! না কোনো ফোন না পেজারে একটা মেসেজ হঠাৎ করে ... 

- তো কি ! এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে নাকি

সহেলীর ফোড়ন কাটা শুরু হল 

- আরে যান না মশাই এমন মধুর আহ্বান , পাষন্ড ছাড়া কেউ উপেক্ষা করে

" সোহেলী তোকে গলা টিপে ... " ভেতরের পুরুষ সিংহটা গজরাচ্ছে বাইরে ভিজে বেড়াল ।মোলায়েম সুর বললাম 

- না মানে অনেক দিন পরে দেখা তো   দত্তদা এদিকটা আপনি একটু ... 

- বুয়েচি বুয়েচি আর বলতে হবে না ম্যানেজ হয়ে যাবে  

দত্তদার বরাভয় পাওয়া গেছে

বেরিয়ে পড়লাম দুটিতে  

 

.

 

- রীনা আমি যে বাড়িটায় কাজ করি সেটার নাম কি ভুলে গেলি ?

- না মনে আছে চাকরী যেনো আর কেউ করে না  

- বাকী সকলের সঙ্গে আমাদের ব্যাপারটা ঠিক মেলে না  

- বেশী ফান্ডা ঝাড়িস না তো  

- সিরিয়াসলি আমাদের অনেক  প্রোটোকল মানতে হয়  

- ওঃ অসহ্য অসহ্য স্টপ ইট তোর ন্যাকামো আর নিতে পারছি না রে

- সেই একই রকম রয়ে গেলি বল ? ফার্স্ট ইয়ারে যেমন ছিলিস কোনো পরিবর্তন নেই

- আর তুই ? একটা বুড়ো ভাম হয়েছিস জঘন্য  

- উহু , ভুল হলো বুড়ো নয় ম্যাচিওর্ড  

- বাদ দে , অনেক হয়েছে , চল নন্দনে যাবো  

- সেকি রে ! আর নিউ মার্কেট ? শপিং

- গুলিমার তো বুদ্ধু কোথাকার

 

নন্দনে যে ইংরেজি ছবিটা চলছে সেটা রীনার পছন্দ হলো না বলল

- আচ্ছা ' মায়ামেমসাব ' চলছিল না ?

- উঠে গেছে গত সপ্তাহে

- ধ্যাৎ ভাল্লাগেনা

- কেনো ? হামলে পড়ে দেখার মতন কি আছে ওতে

- প্রেম , বুঝলি ? নিখাদ নিঃস্বার্থ প্রেমের সন্ধান সে সব তোকে বলে আর কি লাভ ? তুই কি বুঝবি বল ? নিরস কোথাকার

- রসিক পরিচয় দেবার আর সুযোগ ঘটল কৈ

রীনার ঠোঁটে আলপিন হাসি দেখে ভরসা হল ভাবলাম এ্যাডভান্টেজ নেওয়া যাক বাংলা একাডেমিতে কবিতা পাঠের আসরে যাবার প্রস্তাব দিলাম এমন কটমট করে তাকালো যে আমি একেবারে চুপসে গেলাম এখন আমরা রবীন্দ্র সদনের সামনের সিঁড়িতে বসে আছি আর বাদাম ভাজা চেবাচ্ছি যারা দেখছে তাদের কাছে আমাদের একটাই সম্পর্ক থাকতে পারে হায়রে

- এই রীনা আমরা ঠিক কি করছি রে ? প্রেম করছি

- মরি মরি ! কত ঢং  

- আচ্ছা বুঝেছি নির্ভেজাল প্রেমের সন্ধান করছি কি ঠিক বললাম তো ?

- নে চল এখানে বসে থাকলেই তোর মাথায় উল্টো পাল্টা ভাবনা আসবে চল ওঠ  

- আরে যাবোটা কোথায় বলবি তো ?

- কোথায় আবার ! আমাদের বাড়ী মা তোকে দেখলে ভীষণ খুশি হবে কত দিন যাসনি বল তো

 

 

.

 

রীনাদের বাড়ীটা ভবানীপুর মেট্রো স্টেশন থেকে পায়ে হেঁটে মিনিট দশেক হবে বিশাল বনেদী বাড়ী দেখলে সম্ভ্রম জাগে 'ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই' এই অপ্ত বাক্যের ওপর ভরসা রেখে শরীকি বিবাদের চিহ্ন স্বরূপ বাড়ীর বাইরের দিকের দেওয়ালটা মোহন বাগানের জার্সি হয়ে গেছে বাড়ীতে পা রেখেই রীনা হৈ চৈ শুরু করে দিলো আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে দোতলায় তুলল সেই সঙ্গে তুমুল চিৎকার 

- মা দেখো কার পায়ের ধুলো পড়েছে আজ তোমার ঘরে  

- ওমা সত্যি তো ! কি সৌভাগ্য আমার এদ্দিনে মনে পড়লো তাহলে

টুক করে প্রণামটা সারা হয়ে গেল এবার আত্মপক্ষ সমর্থনে জোরালো যুক্তি খাড়া করা দরকার

- কাকীমা আপনিও ওর দলে চলে গেলেন আপনি অন্তত আমার অবস্থাটা একবার ভেবে দেখুন কাজের যা চাপ থাকে তারপর বাড়ীতেও নানান ঝামেলা সমস্ত আত্মীয়স্বজনের বাড়ী নেমতন্ন যাওয়া হয় না কত দিন মা রাগ করে , বোন ঠোঁট ফোলায় এখন আর শরীর পারমিট করে না ইচ্ছেও করে না  

- হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই বাবু এখন ভীষণ ব্যস্ত জানো তো মা নিঃশ্বাস ফেলার সময় টুকু হয় না যদি বা কাজ শেষ হয় তো একেবারে পাশের টেবিলেই এসে জুটেছে রঙিন প্রজাপতি সর্বক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে  

- আহ্ কি হচ্ছে টা কি ? তুই থামবি কাকীমা ওর কথায় কান দেবেন না বদ্ধ উন্মাদ একটা  

রীনার মা ভদ্র মহিলা যথেষ্ট লিবারাল এরপর আর ঘরে থাকা চলে না বুঝে ফর্মালি চা আনার নাম করে রান্না ঘরে চলে গেলেন  

 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোঁপার বাঁধন আলগা করছে শাড়ী পরেছিল আজ পরতে খুব ভালোবাসে গুছিয়ে পরিপাটি করে পরতেও পারে এবং সেটা অন্যের সাহায্য ছাড়াই নিজেকে চমৎকার ক্যারি করতে পারে আজকালকার মেয়েদের মত নয় , শাড়ী পরলেই জবুথবু সখী আমায় ধর টাইপের ভাব যেন শাড়ী পরে দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলেছে কলেজের সময় থেকেই  রীনাকে দেখেছি কোনো অকেশন ছাড়াই শাড়ী পরতে যে কোনো দিন এলেই যেনো পরিবেশটা পাল্টে যেতো চতুর্দিক ঝলমল করে উঠত শাড়ীর ব্যাপারে ওর অবসেশন আছে আজ যেটা পরেছিল কচি কলাপাতা রঙের তাঁতের শাড়ী সম্ভবতঃ ধনেখালি আমি খাটে বসে আড়াআড়ি চোখ রেখেছি শাড়ী পরা মেয়েদের এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য ধরা পড়ে আয়নার ভিতর দিয়ে রীনার চোখে চোখ পড়ল সঙ্গে সঙ্গে বুকসেল্ফের দিকে মনোনিবেশ করলাম হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই ঝপাস করে বিছানায় এসে পড়লো এলো চুলগুলো পিঠের উপর ছড়িয়ে দিয়ে উপুড় হয়ে শুলো তাকিয়ে রইল নিষ্পলক এবার  কবিতা পড়ে শোনাতে হবে আব্দার , কোনো ওজর আপত্তি মানবে না বোঝো ঠ্যালা ! কোথায় অফিস থেকে ফিরে তারিয়ে তারিয়ে চা উপভোগ করবো তা নয় এখন বকে মরতে হবে ? যা ছিনে জোঁক, সহজে ছাড়বার পাত্রী নয় কাকীমা অবশ্য আগেই চা রেখে গেছেন সঙ্গে মুড়ি আলুভাজা পাঁপড় ভাজা নারকেল কুচি বেশ বড় দুটো সন্দেশ আর ক্ষীরের সিঙ্গাড়াও আছে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললাম 

- আচ্ছা কি ব্যাপার বল তো ? তখন বাংলা একাডেমিতে যেতে চাইলি না অথচ এখন আবার ...

- তুই পড়বি কিনা বল ? আমি তোর গলায় কবিতা শুনতে চাই

 

সর্বনাশ ! অন্তরাত্মা যেনো কেঁপে কেঁপে ওঠে থাক থাক খুব সাবধান ! শুভেন্দু ভট্টাচর্য্য সংযত হও এখনো তোমার ছোট বোনটার বিয়ে বাকী বিধবা মা চোখে ছানি নিয়ে দুবেলা হেঁশেল ঠেলছে অপারেশন করা আশু প্রয়োজন কিন্তু আজ হবে কাল হবে করে পিছিয়েই যাচ্ছে নানান অছিলায় কারণ টাকার জোগাড়ের দুশ্চিন্তা থেকে তোমাকে মুক্তি দিতে চায় বহু কষ্টে সংসার খরচ বাঁচাবার চেষ্টায় নিজেকে সদা সর্বদা নিয়োজিত রাখে উত্তর কলকাতার সাবেকী ভাড়া বাড়ীতে থাকো তাই এখনো কোনো মতে দিনগত পাপক্ষয় চলছে নইলে যত টাকা ভাড়া দাও তাতে করে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ আর কোথাও পাবে ? হড়হড়ে শ্যাওলা ধরা কলতলা , ডজন খানেক আরশোলা আর মাকড়সা যার স্থায়ী বাসিন্দা যার মাথার ওপর টিনের চালে সলমা জরীর কারুকার্য তাই দেখে যদি বধূ নাক সিঁটকোয় ! তবে কি তাকে দিতে পারবে ইতালীয়ান মার্বেল বসানো প্লাস্টিক পেন্ট করা ঝকঝকে স্মার্ট টয়লেট নিজের ভিতরে যে সুখ পাখিটা ডানা মেলতে চাইছে তাকে বোঝাও সে যেনো নির্মহ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ভঙ্গি নিয়ে কবিতা পড়ে  

আচ্ছা বেশ , তাই পড়বো এবার হলতো শান্তি ?  

 

.

 

রীনাকে পুরোপুরি তৃপ্ত হতে দেবো না বলেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'সাগর থেকে ফেরা' হাতে তুলে নিলাম ছেয়েছিল নিবারণ চক্রবর্তীর কবিতা পড়ি আসলে ওরো একদিন অমিত রায় ছিল কখন যে কেটি দত্ত তাকে নিয়ে কেটে পড়লো মওকা বুঝে ! এখন বন্যা একা সে কাহিনী আমি জানি কিন্তু ওহে কন্যা বন্যা আমি যে তোমার শোভনলাল হতে পারবো না এটা প্রথম থেকেই বুঝে নেওয়া ভালো  

আমি পড়ছি আর রীনা শুনছে যে পাঠ করে তার এক ধরনের তন্ময়তা তৈরী হয় তার মধ্যেই আড়চোখে লক্ষ্য করছিলাম মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে এই প্রশান্তি এই আলেয়া আলেয়া রহস্য এই কুলপীর মতন শীতল ভালোলাগা অথবা এই জুঁই ফুলের মতন সুরভী ছড়ানো একটি সন্ধ্যা এর কোনো কিছুই অর্থ মূল্যে পাওয়া যায় না   ডুবছিলাম , ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিলাম সুখ সাগরে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল সব হট্টগোলের শব্দ উঠে আসছিল একতলা থেকে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে বারান্দার রেলিঙে বুক পাতলাম কেলেঙ্কারি এবার দৃষ্টি গোচর হলো সংক্ষেপ করলে এই রকম দাঁড়ায় :

একতলা থেকে দোতলায় ওঠার এবং ছাদে যাবার একটাই সিঁড়ি বাড়ীর অন্যান্য অংশ ভাগ হলেও সিঁড়িটা থেকে গেছে কমন নতুন তৈরী করবে এমন বাপের ব্যাটা এখন আর কেউ নেই রীনার একটি জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ভাই রয়েছে বয়েস তার ষোল কি সতেরো হবে তবে বুদ্ধি বৃত্তির কাঁটা আটকে আছে তিন সাড়ে তিনের ঘরে নির্বোধটার জন্যই যত কান্ড পাশের অংশের শরীকদের ঘরে আজ গেষ্ট এসেছিল তেনারা যাবার সময় হঠাৎ উঠোনের চৌবাচ্চা থেকে জল তুলে রকটা ধুতে শুরু করে কারণটা কি ? দেবান জানন্তিঃ তা সেই জল কিছুটা চলকে পড়েছে কোনো এক মহীয়সি রমণীর দামী শাড়ীর আঁচলে ব্যাস আর যায় কোথায় ! অকথ্য গালিগালাজ শুরু হয়েছে ওদিকের গিন্নীর শেষ সংলাপটুকু কানে এল 

"এমন জন্তু পেটে ধরার আগে ডুবে মরতে পারলিনারে পোড়ার মুখি ? নাকি কলসী দড়িটাও জোটেনি ! নিজে মরতে না পারিস যেটাকে জম্ম দিলি সেটাকে তো নুন গিলিয়ে মারতে পারতিস না কি ? " 

 

অতিথিরা সবাই চলে গেছে নাক সিঁটকিয়ে ভুরু কুঁচকে ঠিক যেভাবে সদ্য বিধবা ডিমের খোলা টপকে চলে সে ভাবে তবু বাক্য বর্ষণ বন্ধ হয়নি রীনার বাবা বাড়ীর চৌকাঠে পা দিয়ে দৃশ্য দেখে পাথর হয়ে গেছেন গলদঘর্ম হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্থানুবৎ দুহাতে ভারী বোঝা সম্ভবত মাস কাবারি বাজারি জবজবে ভিজে ফতুয়ার তলায় বুকটা হাপরের মত ওঠা নামা করছে রীনার এক তুতদাদা নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে গোটা ব্যাপারটা নিরীক্ষণ করে মাত্র একটা শব্দ ব্যয় করলো 'রাবিশ' থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে রেলিং ধরে বারান্দায় বসে পড়লো রীনা দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে যাচ্ছে সেই সঙ্গে ফোঁপানির মৃদু শব্দ একমাত্র মানুষ যিনি ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল হন নি অবিচল আছেন তিনি কাকীমা , রীনার মা , নামানুষি প্রাণীটার মা   

 

জলকাদা মাখা বিপর্যস্ত ছেলেটাকে বুকে করে নিয়ে এলেন ওপরে গা মুছিয়ে দিয়ে শুকনো পোষাক পরালেন কারোর সাহায্য ব্যতীতই খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে এক কোণে বসালেন একটাই কথা বললেন রীনার উদ্দেশ্যে 

- অনেকক্ষণ সন্ধ্যে উৎরেছে বাইরের কাপড় ছাড় রান্নাঘরে আয়, জরুরী কাজ আছে   

 

 

.

 

চলে এলাম দক্ষিণ থেকে উত্তরে এই বেশ দিব্যি মজা তাই না ? পৃথিবীর পেট ফুঁড়ে শহরের প্রান্ত থেকে প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া পলিউশন ফ্রী ট্রান্সপোর্ট 'দরজা বন্ধ করা হচ্ছে ডোর্স আর ক্লোজিং ' চিচিং বনধ্ চিচিং ফাঁক দেহমন যে পরিমাণে ক্লান্ত তাতে সোজা বাড়ী ফেরাই স্বাভাবিক ছিল তবু এখন মোড়ের চায়ের দোকানে বসে ভাঁড়ে চুমুক দিচ্ছি সারাদিনের ফিল্ম ফুটেজ যা মগজে ধরা ছিল সেটা রি-ওয়াইন্ড করি কি বিচিত্র পরস্পর বিরোধী চিত্রমালা ! এরই নাম নিত্য নৈমিত্তিকতা কিম্বা প্রাত্যহিকতার অঙ্গ চায়ের দোকানে কয়লার উনুন সকালের ঘুগনির জন্য মটর সেদ্ধ বসিয়েছে চোখ ছাপিয়ে যে জলটুকু বাইরে আসতে চাইছে উপস্থিত লোকজন নিশ্চই ভাবছে সেটা উনুন নির্গত কার্বন মনোক্সাইডের প্রভাব বাহ্ দিব্যি ম্যানেজ হয়ে গেল তো

শেষ চুমুকটা দেবো ধোঁয়া ভেদ করে ঝাপসা চোখে হঠাৎ দেখি মা আমার কোথায় যেন চলেছে গুটি গুটি পায়ে এক ছুটে সামনে এসে দাঁড়ালাম 

- কি ব্যাপার ? কোথায় চললে এতো রাতে

- খোকন তুই এসেছিস ! যাক নিশ্চিন্দি যা ঘরে যা , ঠাণ্ডা ' আমি এক্ষুনি আসছি মুন্নীকে বলিস চা করে দেবেখন  

- সেতো বুঝলাম কিন্তু তুমি যাচ্ছ কোথায়

- তুই ঘরে যা না বাবা সারাদিন খেটেখুটে এলি আমি এই যাবো আর আসবো  

 

বাড়ীতে ফিরলাম বাইরের ঘরে মুন্নীর ছাত্র ছাত্রী বসে আছে বোধহয় নিজের জন্য চা বানাতে রান্নাঘরে এসেছিল বললাম 

- হ্যাঁরে মা এতো তাড়া করে কোথায় গেলো

- তোর সঙ্গে মার দেখা হয়েছে ! দাদা চা খাবি করবো

- না এই মাত্র খেলাম তোকে যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দে না

- উফ্ মা অন্ত প্রাণ ওদিকে খোকন সোনার জন্য মাও কেঁদে বাঁচে না  

- ফাজলামো করিস না তো মুন্নী ...

- তবে নাতো আবার কি ? খোকন সোনা আমার মোচার ঘন্ট খেতে খুব ভালোবাসে তাই তো মা ছোলা আর বড়ি কিনতে বেরোলো এতো রাতে

- কী হেঁয়ালি করছিস

- হেঁয়ালি আবার কিসের ? ভাটপাড়া থেকে বৌদিরা এসেছিল সঙ্গে ' মামীও ছিল  দুঃখ করে বলছিল মহম্মদ পর্বতের কাছে না গেলে পর্বতকেই মহম্মদের কাছে আসতে হয়। এই এত্তো বড় নারকেল আর এত্তো বড় একটা মোচা দিয়ে গেছে খোকন সোনার জন্য সেই জন্যই তো মা পড়ি তো মরি করে ছুটলো ওরা তোকে নেমতন্নও করে গেছে গেশ করতো কেনো ?

- আজব তো ! কি করে জানবো ?

- মা এলে সব বলবে শুনিস আমি যাই রে দাদা , আমার স্টুডেন্ট বসে আছে  

 

আর পারছি না নিজেকে ধরে রাখতে ভাতের ফ্যানের মতো বুকের ভেতর থেকে কি যেনো একটা উঠলে উঠছে সচেতন মন বলছে না শুভেন্দু ভট্টাচার্য্য না ; তুমি একজন পরিপূর্ণ যুবক একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ মানুষ তোমার এহেন আবেগ প্রবণতা বেমানান চটপট জামাপ্যান্ট ছেড়ে কলঘরে ঢুকে পড়লাম হুড়মুড় করে ঠাণ্ডা জল দিলাম ঢেলে আহ্ কি পরম শান্তি ধুয়ে যাক সারাদিনের ক্লেদ ক্লান্তি মলিনতা সব ধুয়ে যাক চোখের জল আর চৌবাচ্চার জল সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলো ফুটো চালের ভেতর দিয়ে আকাশ দেখতে পাচ্ছি চোখ ঝাপসা হয়ে আছে দু' হাত জোড় করে স্বগতোক্তি করলাম - মা মাগো , জগতে তোমার চাইতে বড় ব্রেক ডাউন ভ্যান আর দ্বিতীয়টি নেই ।বাকী সকলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে কিন্তু সন্তানকে যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজের পায়ে দাঁড় করাতে পারছো , ততক্ষণ তোমার বিরাম নেই মা মাগো তুমি যে আমার এক অক্ষরের ভুবন মা  

No comments:

Post a Comment

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল সহযোগি...