মন্দির টেরাকোটার দুর্লভ গ্রন্থ চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত রচিত বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা
সদ্য প্রয়াত চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান গবেষক। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বহুবিধ।গবেষণালব্ধ ফলাফল লিপিবদ্ধ হয়েছে পুস্তকে।তাঁর কয়েকটি বহুল পঠিত পুস্তক-আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবন,পরিচিতি ও বর্ণনা মৃলক তালিকা, বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা, ভারত সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা এবং দক্ষিণ পশ্চিমবঙ্গের মূর্তিশিল্প ও সংস্কৃতি।
তাঁর বহুল পঠিত বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা বইটি লেখা হয়েছে মন্দিরগুলির সরজমিনে ক্ষেত্রসমীক্ষা করার পর।বৈষ্ণব সংস্কৃতির সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে ধর্মের ব্যবহার তাঁর মনকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছিল।তিনি তাঁর আকর্ষিত বিষয়ের গবেষণার ফলাফল বইটিতে তুলে ধরেছেন বলে সাধারণ পাঠকের কাছেও বইটি সমান জনপ্রিয়।
এই বইটিতে তিনি তুলে ধরেছেন প্রাক প্রাচীন যুগের সিন্ধু সভ্যতার টেরাকোটা থেকে রাজণ্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা শিল্পকে।এই প্রসঙ্গে তিনি সুস্পষ্ট ভাবে আলোচনা করেছেন ষোড়শ সপ্তদশ শতকে মল্লভূমের প্রেক্ষাপট,বৈষ্ণব সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে মল্লভূমের চর্চাচিন্তায় নবদ্বীপের প্রভাব, বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটার পশ্চাদ্বর্তী তত্বতাৎপর্য,বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটায় কৃষ্ণলীলার রূপায়ণ বৈচিত্র্য, বিষ্ণুপুরের মন্দির ভাস্কর্যে কবিচন্দ্রের প্রভাব প্রমুখ বিষয় নিয়ে। বইটির ভূমিকা এবং সারসংক্ষেপ পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায় বইটির প্রয়োজনীয়তা কতখানি।প্রথমদিকে আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বিষ্ণুপুরকে মূলভূমি ধরলেও,পরবর্তীতে বিষ্ণুপুরকেই সর্বজনীন তথা ভারতবর্ষ ব্যাপী ছড়িয়ে দেন এই দ্বিতীয় বইটির মাধ্যমে। এই বইটিতে তিনি তুলে এনেছেন প্রাগৈতিহাসিক হরপ্পা থেকে টেরাকেটার বিবর্তিত রূপটিকে। বইটিতে সমাহার ঘটিয়েছেন বিভিন্ন জ্ঞানী গুণী মানুষের উক্তি।যা তাঁর অধ্যাবসায় ও পান্ডিত্য প্রতিফলিত করে।
তাঁর এই বইটি সত্যনিষ্ঠ গবেষণার ফলাফল। গবেষকদের কাছেও বইটি সমানভাবে গ্রহনযোগ্য কারণ তিনি সর্বদা চেষ্টা করেছেন প্রাপ্ত সমস্ত তথ্যের সমাহারে তত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে।যা গবেষণাধর্মী লেখার মূল বিষয়। তাই তাঁর লেখা একাধারে যেমন গবেষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য অন্যদিকে তেমনি সাধারণ পাঠকদের কাছেও সমাদৃত।
টেরাকোটার ইতিহাস আজকের নয়।ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় মহোঞ্জোদাড়ো সভ্যতার সময়ে যে পশুপতিনাথের মূর্তিটি পাওয়া গেছে সেটিও পোড়ামাটির তৈরী।শুধুমাত্র বিষ্ণুপুর, পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতবর্ষে নয় পোড়ামাটির জিনিসপত্রের ব্যবহার হয়েছে সমগ্র বিশ্বে।সেই হিসাবে পোড়ামাটি নিয়ে গবেষণা সহজসাধ্য নয়। সেই জটিল কাজ চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত করেছেন খুব অনায়াসে। এর প্রমাণ রয়েছে মন্দির টেরাকোটা বইটির পাতায় পাতায়। মহোঞ্জোদাড়ো সময় থেকে শুরু করে তাঁর গবেষণা বিস্তৃত হয়েছে সমকাল পর্যন্ত। অস্বীকার করার জায়গা নেই মন্দির টেরাকোটার জগতে বিষ্ণুপুর মন্দির টেরাকোটা একটি পৃথক ঘরানা।এই ঘরানার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা।এই টেরাকোটার বৈচিত্রতা ধরা পড়ে গঠনশৈলীতে ও ভাবনা বৈচিত্রে ।সেইসঙ্গে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় প্রাপ্ত টেরাকোটার নির্মাণ গুলির সঙ্গে। বলাই বাহুল্য চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত বিভিন্ন ভাবে প্রমাণ করেছেন বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা অন্য জায়গায় প্রাপ্ত টেরাকোট অপেক্ষা অনেকাংশেই শ্রেষ্ঠ।
পশ্চিমবঙ্গের মন্দির গুলির মধ্যে টেরাকোটা শিল্পে বিষ্ণুপুরের পাশাপাশি অভিনবত্ব দাবি করে নদীয়া জেলার নবদ্বীপের মন্দির গাত্রের টেরাকোটাগুলি।কিন্তু তাঁদের মধ্যে প্রভেদ গুলির সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত।
চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত ছিলেন উদার মনের মানুষ। তাই মন্দির টেরাকোটায় ব্যবহৃত কৃষ্ণ সব সমস্ত ধর্মীয় ব্যাপার ব্যাখ্যা করেছেন কোনরূপ জড়তা ছাড়াই উদারনৈতিক মনোভাবের দ্বারা। সমস্ত তত্ব ও তথ্যের ব্যাখায় সুস্পষ্ট ভাবে সংযোজন ঘটিয়েছেন মল্লরাজাদের ইতিহাস।
সুতরাং বলা অত্যুক্তি হবে না তাঁর রচিত বইগুলির মধ্যে বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই।যা আমাদের একাধারে যেমন বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের ইতিহাস জানত সাহায্য করে তেমনি ভারতবর্ষের সাপেক্ষে বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা বুঝতে সাহায্য করে।
This comment has been removed by the author.
ReplyDeleteগবেষণাধর্মী এই মনোজ্ঞ লেখাটি বেশ আগ্রহের জন্ম দেয়।
ReplyDelete